যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৩২ জন নিহত

Untitled design (81)

কার্যকর যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও লেবাননে ইসরায়েলি বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। সংবাদ সংস্থা আল জাজিরার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নতুন সহিংসতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে পরবর্তী দফার আলোচনা আজ রবিবার (২১ জুন) সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ও কাতারও অংশগ্রহণ করবে।
তবে, শুক্রবার থেকে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে একটি নতুন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত থাকায় আলোচনাটি জটিল হয়ে পড়েছে। তেহরান মনে করে যে, লেবাননে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অন্যতম শর্ত এবং এটিই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করতে পারে।
লেবাননের বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, গতকাল শনিবার দক্ষিণাঞ্চলীয় নাবাতিয়াহ জেলায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছেন। এদিকে, লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা (এনএনএ) জানিয়েছে, কাফর রেমান গ্রামে ইসরায়েলি হামলায় একজন লেবানিজ সৈন্য নিহত হয়েছেন।
টায়ার জেলাতেও বেশ কয়েকটি হামলার খবর পাওয়া গেছে। বারিশ গ্রামে একটি বাড়িতে হামলায় একই পরিবারের চার সদস্য—বাবা, মা ও তাদের দুই সন্তান—নিহত হয়েছেন। পশ্চিমাঞ্চলীয় বেকা অঞ্চলের সোহমার এলাকায় একটি বাড়িতে হামলায় আরও চারজন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন।
লেবাননের স্বাস্থ্য জরুরি অপারেশন কেন্দ্র জানিয়েছে, সাইদা জেলার কানারিত এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত সাতজন নিহত ও ১৩ জন আহত হয়েছেন। লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৮৩ জন নিহত ও ১৪১ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশই দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দা।
লেবাননের টায়ার শহর থেকে আল জাজিরার হাইডি পেট জানিয়েছেন, শনিবার মধ্যরাত থেকে দক্ষিণ লেবাননে শতাধিক ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, “আজকের দিনটি খুবই ভয়াবহ। নিহত ও আহতদের মধ্যে বহু বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন।” তিনি আরও জানান, লেবাননের সেনাবাহিনীর সদস্যরাও হামলার শিকার হয়েছেন। মোটরসাইকেল চালানোর সময় এক সৈন্য নিহত হন, যা সেনাবাহিনীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২ মার্চ শুরু হওয়া নতুন এই সংঘাতে অন্তত ৪,০৫৭ জন নিহত এবং ১২,১২১ জন আহত হয়েছেন। বৈরুত থেকে আল জাজিরার রব ম্যাকব্রাইড বলেন, “এটি যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুর প্রকৃতিকে তুলে ধরে। একই সাথে, এটি এও তুলে ধরে যে পুরো আলোচনা প্রক্রিয়াটি লেবাননের পরিস্থিতির উপর কতটা নির্ভরশীল।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, লেবাননে যুদ্ধের অবসান ঘটানো বৃহত্তর যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। লেবাননের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে যে, লেবাননে স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে ইসরায়েল তার হামলা অব্যাহত রেখেছে। লেবাননের এমপি নাজাত আউন সালিবা বলেছেন, “লেবাননের জনগণ ক্লান্ত। তারা এই হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে অতিষ্ঠ।”
তিনি আরও বলেন যে, ইরান-ইরাক যুদ্ধে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ উভয়ই লেবাননের ভূখণ্ড ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ বলেছে যে, তারা নাবাতিয়া অঞ্চলের কাছে অগ্রসরমান ইসরায়েলি সৈন্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে যে, হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে রাতভর দক্ষিণ লেবাননে মোতায়েন সৈন্যদের লক্ষ্য করে ৫০টিরও বেশি রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরও বলেছে যে, দক্ষিণ লেবাননে একটি অভিযানে আরও একজন সৈন্য নিহত হয়েছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির পর থেকে নিহত ইসরায়েলি সৈন্যের সংখ্যা বেড়ে পাঁচ হয়েছে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তারপর থেকে, লেবানন সরকার যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করে আসছে। একই সময়ে, বৈরুত দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে।

Description of image