ইউক্রেনকে ধ্বংস করতে রাশিয়া ১২০টি উত্তর কোরীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে
ইউক্রেনের একজন সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার মতে, ইউক্রেনে হামলা চালানোর জন্য উত্তর কোরিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট পশ্চিম রাশিয়ায় মোতায়েন শুরু করেছে। এই ইউনিটে ১২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছয়টি লঞ্চার থাকতে পারে। ইউক্রেন উন্নতমানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তীব্র ঘাটতির সম্মুখীন। আর এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে রাশিয়া ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যা ধ্বংস করা তুলনামূলকভাবে কঠিন।
২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের দিকে বেশ কয়েকটি উত্তর কোরীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তবে, উত্তর কোরীয় ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর এই মোতায়েনকে মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে চলমান বৃহত্তর সামরিক সহযোগিতার একটি নতুন পর্যায় বলে মনে করা হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রধান গোয়েন্দা অধিদপ্তরের আন্দ্রি চেরনিয়াক বলেছেন, প্রায় ৯০ জন উত্তর কোরীয় সৈন্য নিয়ে গঠিত এই ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটটিকে রাশিয়ার ভোরোনেঝ অঞ্চলের ১১২তম মিসাইল ব্রিগেডের অধীনে মোতায়েন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
চেরনিয়াক বলেছেন, পিয়ংইয়ং ইতোমধ্যে ৪০টি কেএন-২৩ এবং কেএন-২৪ ক্ষেপণাস্ত্রসহ একটি সৈন্যদল রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। তবে, কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হবে এবং মোট ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা আগামী মাসে একটি শীর্ষ-পর্যায়ের বৈঠকে চূড়ান্ত করা হবে। রাশিয়া আশা করছে, এই মোতায়েনে ১২০টি উত্তর কোরীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছয়টি লঞ্চার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে উত্তর কোরীয় সৈন্যরা কী ভূমিকা পালন করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
গত সপ্তাহে, রাশিয়া আগস্টের পর প্রথমবারের মতো ইউক্রেনে দুটি উত্তর কোরীয় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যা এই মোতায়েন সম্পর্কে চেরনিয়াকের তথ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফিলাডেলফিয়া-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর সিনিয়র ফেলো রব লি বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার এই সমর্থন কিয়েভের জন্য একটি বড় হুমকি। তিনি বলেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইউক্রেনের অন্যতম দুর্বল দিক, তাই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে এর ঝুঁকি আরও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন যে, আগামী শীতে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে, যখন রাশিয়া অতীতের মতোই আবারও বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর ব্যাপক হামলা চালাতে পারে। রয়টার্স চেরনিয়াকের দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তিনি বলেন, সংবেদনশীলতার কারণে গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং নিউইয়র্কে জাতিসংঘে অবস্থিত উত্তর কোরিয়ার দূতাবাস মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে উত্তর কোরিয়া মস্কোর অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালে দুই দেশ একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার জন্য লক্ষ লক্ষ কামানের গোলা সরবরাহ করেছে এবং ইউক্রেনের স্থল আক্রমণ প্রতিহত করতে রাশিয়ার কুর্স্ক অঞ্চলে ১৪,০০০ সৈন্য পাঠিয়েছে।
গত সপ্তাহে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, উত্তর কোরিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র মধ্য ইউক্রেনের রাদুশনে গ্রামের একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানে, এতে একই পরিবারের অন্তত পাঁচজন নিহত হন। চেরনিয়াক বলেছেন, গত সপ্তাহের হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছিল ২৫শে আগস্টের পর উত্তর কোরিয়ার প্রথম নথিভুক্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে এগুলো ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্রের একটি নতুন চালানের অংশ ছিল।
ইউক্রেনীয় সামরিক সূত্র অনুসারে, উত্তর কোরিয়ার কেএন-২৩ এবং কেএন-২৪ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো রাশিয়ার সমতুল্য ইস্কান্দার ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশি পাল্লা এবং বৃহত্তর পেলোড বহন করতে সক্ষম হলেও, এগুলো অনেক কম নির্ভুল। এ কারণেই এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বেশি বলে জানা যায়।
রাশিয়া ২০২৩ সালের শেষের দিকে ইউক্রেনে কেএন-২৩ এবং কেএন-২৪ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ শুরু করে। চেরনিয়াক বলেছেন, উত্তর কোরিয়া ২০২৩ সালের শেষ থেকে ২০২৫ সালের আগস্টের মধ্যে রাশিয়াকে এই ধরনের ১৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। তিনি আরও যোগ করেন যে, ইউক্রেন সীমান্তবর্তী রাশিয়ার কুর্স্ক অঞ্চলে প্রায় ৯,৫০০ উত্তর কোরীয় সৈন্য রয়েছে, কিন্তু তারা বর্তমানে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি সামরিক অভিযানে জড়িত নয়। গত মাসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ক্রেমলিন পিয়ংইয়ংকে আরও ৩০ হাজার উত্তর কোরীয় সৈন্য পাঠাতে বলেছে এবং রাশিয়ার ভোরোনেঝ অঞ্চলে তাদের গ্রহণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সূত্র: এনডিটিভি
