স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের পর ফিলিস্তিনিরা আনন্দে বিভোর

Untitled design - 2026-07-20T175645.140

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের এক রোমাঞ্চকর ফাইনালে স্পেন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়েছিল। অতিরিক্ত সময়ে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেন তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয় করে।
স্পেনের দলটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি গ্রহণ করে। স্পেনের এই বিশ্বজয়ের পর ফিলিস্তিন জুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে অবরুদ্ধ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় এই বিজয় কেবল একটি ফুটবলীয় সাফল্যই নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের প্রতি স্পেনের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতার এক অনন্য প্রকাশে পরিণত হয়েছে।
ইসরায়েলি আগ্রাসনে বিধ্বস্ত গাজায় বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁবু বা ধ্বংসস্তূপের নিচে সশরীরে খেলা দেখা অসম্ভব ছিল। তাই গাজার বিভিন্ন এলাকায় বড় পর্দার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যেখানে শত শত ফিলিস্তিনি ম্যাচটি উপভোগ করার জন্য ক্যাফে ও খোলা জায়গায় জড়ো হয়েছিল। রেফারি চূড়ান্ত বাঁশি বাজানোর সাথে সাথেই সেই সমাবেশ এক স্বতঃস্ফূর্ত উদযাপনে পরিণত হয়।
ফিলিস্তিনি যুবক ও শিশুরা স্পেনের পতাকা হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে স্প্যানিশ দলকে উল্লাস ও করতালি দিয়ে স্বাগত জানায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলমান ইসরায়েলি নৃশংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গাজার শিশুরা একে অপরকে আলিঙ্গন করছে এবং এই বিরল আনন্দের মুহূর্তটি উদযাপন করছে। ওমানের সমাজকর্মী শাবান আহমেদ আল-আজিলিসহ অনেকেই লিখেছেন, “গাজা তার পাশে দাঁড়ানো বন্ধুদের কখনো ভোলে না; এই বিজয় শুধু একটি ফুটবল বিজয় নয়, এটি ধ্বংস ও গণহত্যার যন্ত্রণার ভেতর থেকে আসা কৃতজ্ঞতার এক বহিঃপ্রকাশ।”
ফুটবল মাঠের এই বিজয় ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক মহলেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ এবং প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজকে পাঠানো এক অভিনন্দন বার্তায় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এই বিজয়কে একটি “মহান বৈশ্বিক ক্রীড়া সাফল্য” বলে অভিহিত করেছেন।
স্বাধীনতাপন্থী সংগঠন হামাসের পক্ষ থেকে কর্মকর্তা বাসেম নাইম স্পেনের এই যোগ্য বিজয়কে স্বাগত জানিয়েছেন এবং ফিলিস্তিন ও তার সমর্থকদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেথলেহেম, হেবরন এবং নাবলুসের মতো শহরগুলোতেও শত শত ফিলিস্তিনি বিজয় মিছিলে স্পেনীয় ও ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। ফিলিস্তিনি কার্টুনিস্ট আলা আল-লাকতা এবং মোহাম্মদ সাবানেহ তাদের আঁকা ছবিতে লামিন ইয়ামালসহ স্পেনীয় খেলোয়াড়দের হাতে ফিলিস্তিনি পতাকা তুলে দিয়ে দুই দেশের মধ্যে সংহতি প্রকাশ করেন।
উল্লেখ্য যে, ইয়ামাল এর আগেও বার্সেলোনার লা লিগা জয়ের উদযাপনের সময় ফিলিস্তিনি পতাকা তুলে ধরেছিলেন।
ফিলিস্তিনিদের এই বাঁধভাঙা আনন্দের প্রধান কারণ হলো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রতি স্পেনের কঠোর কূটনৈতিক অবস্থান। ২০২৪ সালের মে মাসে স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়, যা ইসরায়েলকে ক্ষুব্ধ করে। এরপর মাদ্রিদ কঠোর পদক্ষেপ নেয়, যার মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সাল থেকে ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ, বসতি স্থাপনের ওপর বিধিনিষেধ কঠোর করা এবং তেল আবিব থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করা।
সম্প্রতি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং ফিলিস্তিনের জন্য উন্নয়ন তহবিল বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে, ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরাজয় ফিলিস্তিনিদের জন্য আরেকটি স্বস্তির কারণ ছিল, কারণ আর্জেন্টিনার বর্তমান রাষ্ট্রপতি হাভিয়ের মিল্লি ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন ব্যক্ত করেছেন, যদিও আর্জেন্টিনার সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল।
ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আলা রিমাবি উল্লেখ করেছেন যে, ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও কর্মকর্তারা রাজনৈতিক কারণে স্পেনের পরাজয় কামনা করেছিল এবং একজন ইসরায়েলি রাব্বি স্পেনের পরাজয়ের জন্য প্রার্থনাও করেছিলেন। যুদ্ধের সমস্ত বৈরিতা ও কষ্টের মাঝে, স্পেনের বিশ্ব বিজয় ফিলিস্তিনিদের জন্য এক টুকরো আনন্দ এবং বিশ্ব মঞ্চে তাদের পাশে দাঁড়ানো বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য সুযোগ এনে দিয়েছে।

Description of image

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি।