ধ্বংসস্তূপ থেকে গাজার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পুনর্গঠনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সংগ্রাম

Untitled design - 2026-07-28T104939.893

ইসরায়েলের দীর্ঘ সামরিক অভিযানের কারণে গাজার শিক্ষা ব্যবস্থা এক ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন, গবেষণাগার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও, গাজার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসস্তূপ থেকে তার শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
যুদ্ধের আগে, গাজার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। প্রতিষ্ঠানটিতে আধুনিক গবেষণাগার এবং গবেষণা সুবিধা গড়ে উঠেছিল, যেখানে চিকিৎসা, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান এবং প্রকৌশলের মতো ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ-ভিত্তিক বিষয়গুলির উপর বিশেষ জোর দেওয়া হতো।
শিক্ষার্থীরা নিয়মিত গবেষণাগারে সময় কাটাত। তারা চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করে, নমুনা পরীক্ষা করে এবং শ্রেণীকক্ষে শেখা তত্ত্বগুলিকে বাস্তবে প্রয়োগ করে ভবিষ্যতের পেশাগত দক্ষতার জন্য প্রস্তুতি নিত।
কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সাথে সবকিছু বদলে যায়। ধারাবাহিক হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, গবেষণাগার এবং প্রশিক্ষণ অবকাঠামোর একটি বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। একই সময়ে, গাজার উপর কঠোর অবরোধের কারণে শিক্ষামূলক উপকরণ আনা-নেওয়া করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি সমন্বয়কারী ইয়াসিন বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে মেডিসিন ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বিভাগের জন্য নতুন অ্যানাটমি মডেল এবং প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পৌঁছায়। এই সরঞ্জামগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মপরিবেশের সাথে পরিচিত করানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই উদ্যোগকে আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত বিশ্ববিদ্যালয়-
ইসরায়েলি হামলায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি একাডেমিক ভবন ধ্বংস হয়ে যায়। প্রায় ৫০০টি শ্রেণিকক্ষ, ২০০টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার এবং ৭৫টি কম্পিউটার ল্যাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটি ২ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি বই, গবেষণা জার্নাল, রেফারেন্স সামগ্রী এবং একাডেমিক থিসিস হারিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অনুষদের ডিন আব্দুল রউফ আল-মানামা বলেন, গত তিন বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সময় ছিল। তার মতে, এই হামলায় শুধু ভবনই নয়, গবেষণা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ক্লিনিক, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং পাঁচ দশক ধরে গড়ে ওঠা জ্ঞানভাণ্ডারের একটি বড় অংশও ধ্বংস হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, এখন সেখানে যা দাঁড়িয়ে আছে তা মূলত একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ। যুদ্ধের সময় ব্যাপক স্থানচ্যুতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ভবন আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শ্রেণীকক্ষের অভাব, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিভ্রাট এবং ছাত্র ও শিক্ষকদের মানসিক চাপ শিক্ষামূলক কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
ল্যাবের পরিবর্তে ভিডিও, শ্রেণীকক্ষের পরিবর্তে হাসপাতাল-
ফিলিস্তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউনেস্কোর একটি যৌথ মূল্যায়নে দেখা গেছে যে ২০২৩ সালের পর গাজার বেশিরভাগ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে। অনেক বিশেষায়িত গবেষণাগার আর ব্যবহারযোগ্য নয়। ফলস্বরূপ, যেসব বিষয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, সেগুলো এখন প্রায়শই তাত্ত্বিক পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এই সংকট মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভার্চুয়াল সিমুলেশন, ভিডিও-ভিত্তিক পরীক্ষা এবং রেকর্ড করা ল্যাব সেশন ব্যবহার করছে। এই বিকল্প পদ্ধতিগুলো চিকিৎসা বিজ্ঞান, জৈব রসায়ন, রক্তবিজ্ঞান, আণবিক রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা আলোকবিজ্ঞান এবং ফিজিওথেরাপির মতো বিষয়েও ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে, আল-মানামার মতে, এই ব্যবস্থাগুলো কেবল অস্থায়ী সমাধান। বাস্তব গবেষণাগারের অভিজ্ঞতা ছাড়া শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের নতুন শ্রেণীকক্ষ—হাসপাতাল:
চিকিৎসা শিক্ষার্থী দিমা মুহাইসেনের জন্য পুরো শিক্ষাজীবনই বদলে গেছে। যুদ্ধের আগে তিনি নিয়মিত গবেষণাগারে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ পেতেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চিকিৎসা অনুষদ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর, তার পড়াশোনার একটি বড় অংশ হাসপাতাল-ভিত্তিক বাস্তব অভিজ্ঞতার দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে।
তিনি বলেন যে, তাকে প্রায়শই হাসপাতালের করিডোরে বা রোগীদের ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে ক্লাস করতে হতো। দিমা বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে, আমরা হাসপাতালের এক কোণে বা রোগীর ঘরের মাঝখানে, ডাক্তারদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে ক্লাস করতাম। সেখানে শেখার পরিবেশের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও ছিল না।”
তার মতে, চিকিৎসা শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো একজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে সরাসরি রোগীদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা। যুদ্ধের কারণে সেই সুযোগটি মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
তবে, তিনি এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি গাজার উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, সার্জিক্যাল ইউনিট এবং ক্ষত পরিচর্যা বিভাগে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন। ধীরে ধীরে, তাকে চিকিৎসা কার্যক্রমে আরও বড় দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। নতুন বাস্তবতায় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা
ইয়াসিন বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধান। তিনি বলেন, আগে শিক্ষার্থীরা সরাসরি সরঞ্জাম ব্যবহার করেই তা চালানো শিখত। এখন যেহেতু সেই সুযোগ আর নেই, তাই অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
এই ব্যবধান পূরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে।
এছাড়াও, শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের ঝুঁকি কমাতে গাজার বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি বিকল্প শিক্ষা কেন্দ্র খোলা হয়েছে। অনলাইন ক্লাস, ভার্চুয়াল সিমুলেশন, রেকর্ড করা ব্যবহারিক পাঠ এবং হাসপাতাল-ভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষাকার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

Description of image

পুনর্গঠনের প্রধান বাধা-
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, শুধু ভবন পুনর্নির্মাণ করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না। নতুন ল্যাবরেটরি, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, মাইক্রোস্কোপ, ইনকিউবেটর, জীবাণুমুক্তকরণ যন্ত্র, বিশেষায়িত কম্পিউটার, রাসায়নিক উপকরণ এবং ল্যাবরেটরির প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রয়োজন। কিন্তু গাজায় চলমান অবরোধের কারণে এই সরঞ্জাম ও নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে আসা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথাপি, গাজার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় আশা হারায়নি। কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করে যে, যারা ধ্বংসস্তূপ সত্ত্বেও আজ পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে, তারাই ভবিষ্যতে গাজার পুনর্গঠনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। শিক্ষার্থী দিমা মুহাইসেন বলেন, “আজ শিক্ষায় বিনিয়োগ করার অর্থ হলো আগামীকালের পুনর্গঠনে বিনিয়োগ করা। কারণ শুধু ভবন নয়, মানুষকেও পুনর্গঠন করা সমান গুরুত্বপূর্ণ।”