চুক্তি রক্ষা করা হলেই বিনিয়োগ আসে: মার্কিন রাষ্ট্রদূত
ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, সফল বাণিজ্য সম্পর্কের ভিত্তি হলো পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং চুক্তির নিশ্চয়তা। আস্থা অর্জনের জন্য চুক্তি রক্ষা করা অপরিহার্য। মার্কিন কোম্পানিগুলোর এই আস্থা থাকা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশ সরকার ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো সম্মান করা হবে এবং ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। চুক্তি রক্ষা করা হলেই বিনিয়োগ আসে, আর তা না হলে বিনিয়োগকারীরা অন্যত্র বিনিয়োগের সুযোগ খোঁজেন।
গতকাল মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অফ কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) আয়োজিত এক মধ্যাহ্নভোজ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে তিনি এসব মন্তব্য করেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, তিনি আজ এখানে আসতে পেরে আনন্দিত, কারণ যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশীদার। কিন্তু এখন, এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নতুন করে সাজানোর এক অভূতপূর্ব সুযোগ দুই দেশের সামনে রয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র অতীতের সেইসব নীতি থেকে সরে আসছে যা অপ্রতিসম বাণিজ্য সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করেছে এবং যা অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্য মুনাফা ও অস্বচ্ছ বাজারের জন্ম দিয়েছে। এর পরিবর্তে, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি মডেলের দিকে এগোচ্ছে যা উভয় দেশের জনগণের জন্য পারস্পরিক সুবিধা বয়ে আনবে।
এই নীতি অনুদানের চেয়ে বাণিজ্যকে, সাহায্যের চেয়ে বিনিয়োগকে এবং এমন প্রকৃত অংশীদারিত্বকে অগ্রাধিকার দেয় যা উভয় দেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন সাহায্য-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিনিয়োগ-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে এগোচ্ছে।
তিনি আরও বলেন যে, এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি হলো এই উপলব্ধি যে, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই সম্ভব যখন অংশীদারিত্ব উত্তম অনুশীলনকে উৎসাহিত করে এবং এমন বাণিজ্য সুযোগ তৈরি করে যা সকলের জন্য উপকারী।
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যের সম্ভাবনা:
রাষ্ট্রদূত বলেন যে, এটি বাংলাদেশের জন্য এক অসাধারণ সুযোগের সময়। ১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা, একটি তরুণ ও গতিশীল কর্মশক্তি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থানের কারণে দেশটি একবিংশ শতাব্দীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ (এআরটি) বাস্তবায়িত হলে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে।
তার মতে, এই চুক্তির ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের জন্য ১৯ শতাংশ প্রতিযোগিতামূলক শুল্ক সুবিধা বজায় থাকবে, যা চুক্তিটি না থাকলে ৩৫ শতাংশ হতো। একই সাথে, এতে বাংলাদেশের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা হ্রাস এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকে উৎসাহিত করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি বলেন, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে কিন্তু প্রধানত অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করে, তারা দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য ঘাটতিতে ভোগে, যা টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করে।
তার মতে, ‘আপনি যদি আমাদের কাছে বিক্রি করতে চান, তবে আপনাকে আমাদের কাছ থেকে কেনারও চেষ্টা করতে হবে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন রপ্তানির ওপর মোট শুল্ক ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায় এবং এর সাথে গমের ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয়তা ও কীটনাশকের জন্য অতিরিক্ত পরীক্ষাপদ্ধতিও রয়েছে – যেগুলোকে তিনি অপ্রচলিত ও কঠোর অশুল্ক বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিশ্রুতি:
রাষ্ট্রদূত বলেছেন যে, বাংলাদেশ ৩৫০ কোটি ডলার মূল্যের মার্কিন কৃষি পণ্য—গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা—ক্রয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তিনি বলেন, এই পণ্যগুলো উন্নত মানের এবং বাংলাদেশ সরকার ও বেসরকারি খাত এগুলোর গুণগত মান সম্পর্কে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেখানে অন্যান্য দেশ থেকে কেনা গমের পচনের হার ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল, সেখানে মার্কিন গমে তা ছিল ২.৫ শতাংশ। এছাড়া, প্রোটিনের মাত্রা ১১.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা এলপিজি আমদানির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে পূরণ করা সম্ভব। রাষ্ট্রদূত বলেন, এগুলো কোনো সাহায্য প্যাকেজ নয়; এগুলো বাণিজ্যিক চুক্তি যা উভয় দেশের জন্য কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করবে। তিনি আরও বলেন, এআরটি চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে, যা ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক এবং ভোক্তাদের জন্য ইতিবাচক হবে।

ব্যবসায়িক পরিবেশ ও সংস্কার:
রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা করা দীর্ঘকাল ধরেই একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়, যা দেশি ও বিদেশি উভয় কোম্পানির অভিজ্ঞতায় প্রতিফলিত হয়। তিনি বলেন, এআরটি চুক্তিটি কোনো একতরফা দাবি নয়, বরং দুই দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য একটি যৌথ অঙ্গীকার। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সফল বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন পূর্বাভাসযোগ্য নীতিমালা, স্থিতিশীল নিয়মকানুন এবং স্বচ্ছতা। এছাড়া, মূলধন ও তথ্যের চলাচলে কোনো বাধা থাকা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াগুলোকে আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—ব্যবসা নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং সহজ করা, শুল্ক প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করা, একটি বস্তুনিষ্ঠ নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিশ্চিত করা, মেধাস্বত্ব অধিকার সুরক্ষা, এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শ্রম ও পরিবেশ নীতিমালা বাস্তবায়ন করা। তিনি বলেন, জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধ এবং শ্রম আইন শক্তিশালী করার মতো পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় আরও সক্ষম করে তুলবে।
অংশীদারিত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি:
রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনায় বিশ্বাসী। তারা কোনো ‘ঋণ ফাঁদ কূটনীতি’ বা অকার্যকর প্রকল্পে জড়িত হয় না, বরং প্রকৃত ও দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে। তিনি বলেন, উন্নত প্রযুক্তি, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মার্কিন কোম্পানিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাত:
রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে প্রায় ১৮০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, শেভরন, এক্সেলারেট এনার্জি এবং জিই ভার্নোভা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে অবদান রাখে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক এবং বাংলাদেশের জ্বালানি বৈচিত্র্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে প্রস্তুত। প্রযুক্তি খাতে তিনি বলেন, স্টারলিংক, গুগল পে, ওরাকল, মাইক্রোসফট এবং অগমেডিক্স ইতোমধ্যে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনও প্রায় ৭০ শতাংশ আর্থিক লেনদেন নগদে হয়, যা ডিজিটাল অর্থায়নের প্রসারের জন্য একটি বিশাল সুযোগ তৈরি করে। ভিসা এবং মাস্টারকার্ডের মতো কোম্পানিগুলো এই খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছে।
অবকাঠামো ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা:
রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ফলে আধুনিক অবকাঠামোর চাহিদা বাড়ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র অংশীদার হতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, মার্কিন কোম্পানিগুলো রেল, বন্দর, বিমান, মহাসড়ক এবং নগর পরিবহন খাতে প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান দিয়ে সহায়তা করতে পারে।
তার মতে, এই সহযোগিতা শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলারও একটি বিষয়। তিনি উপসংহারে বলেন, চুক্তি রক্ষা করা হলে বিনিয়োগ আসে – এটাই টেকসই অর্থনৈতিক সম্পর্কের মৌলিক বাস্তবতা।
