সুফিবাদী সংস্কৃতি মননে নিবেদিত সুফি মুহাম্মদ মিজানুর রহমান
মানব জীবনে সাফল্যের নানা দিক রয়েছে। কেউ সম্পদ অর্জনের মাধ্যমে সমাজে সাফল্য লাভ করেন, আবার কেউ আধ্যাত্মিকতার আলো বিকিরণ করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন। কিন্তু এমন মানুষ খুব কমই আছেন যারা পার্থিব সাফল্য এবং সুফি সাধনা—দুটোকেই একসাথে ধারণ করতে পারেন। এমনই একজন আলোকিত ব্যক্তি হলেন সুফি মুহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি ১৯৪৩ সালের ১২ই মার্চ নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের কাঞ্চন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন সুফি মুহাম্মদ দায়েম উদ্দিন এবং মাতা ছিলেন রাহাতুন্নেসা। তিনি ১৯৬১ সালে স্থানীয় ভারত চন্দ্র বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬৩ সালে সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি তোলারাম কলেজ থেকে বি.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। কলেজটি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। এরপর তিনি ব্যাংকিং-এ ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন।
সুফি মিজানুর রহমান উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর নারায়ণগঞ্জের জালাল জুট ভ্যালি কোম্পানিতে ১০০ টাকা বেতনে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি চট্টগ্রামের লালদিঘি শাখায় তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংক অফ পাকিস্তানে (বর্তমানে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড) জুনিয়র ক্লার্ক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখায় তৎকালীন ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডের (বর্তমানে পূবালী ব্যাংক লিমিটেড) বৈদেশিক মুদ্রা বিভাগের ব্যবস্থাপক হিসেবে ৮০০ টাকা বেতনে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মিজানুর রহমান ব্যাংক ছেড়ে ব্যাংক ঋণ নিয়ে নিজের ব্যবসা শুরু করেন। তিনি প্রাথমিকভাবে পণ্য আমদানি করে দেশের বাজারে বিক্রি করে ব্যবসা শুরু করলেও পরে চট্টগ্রামের সীতাকুতে একটি শিপইয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে পুরনো জাহাজের সরঞ্জাম বিক্রি করা হতো। ১৯৮২ সালে তিনি একটি রি-রোলিং মিল এবং ১৯৮৪ সালে দেশের প্রথম বিলেট উৎপাদন কারখানা ‘মংলা ইঞ্জিনিয়ার্স ওয়ার্কস’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি ঢাকায় ‘পিএইচপি রানি মার্কা ধেউতিন’ নামে একটি ঢেউখেলানো টিনের কারখানা স্থাপন করেন। এরপর তিনি অন্যান্য বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি সমস্ত কোম্পানিকে পিএইচপি গ্রুপের অধীনে নিয়ে আসেন। বর্তমানে এই গ্রুপের অধীনে ২৯টিরও বেশি কোম্পানি রয়েছে। তিনি বর্তমানে পিএইচপি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি মুসাম্মাত তাহামিনা রহমানকে বিয়ে করেছেন। এই দম্পতির ৭ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে। তিনি ২০০০ সালে রোটারি ইন্টারন্যাশনালে যোগদান করেন। তিনি ২০১৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত রোটারি ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিক্ট ৩২৮২ বাংলাদেশের গভর্নর ছিলেন। তিনি রোটারি ইন্টারন্যাশনালের একজন ‘আর্চ ক্ল্যাম্প সোসাইটি মেম্বার’। তিনি ও তার স্ত্রী রোটারির একমাত্র ‘কাপল আর্চ ক্ল্যাম্প সোসাইটি মেম্বার’।
শিল্পপতি হওয়া সত্ত্বেও সুফি মিজান অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত। দেশের এক অনন্য ও প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব আলহাজ সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান আমাদের দেশের এক অমূল্য সম্পদ। জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান নিরন্তর দেশ গঠনে নিয়োজিত। তিনি শুধু একজন সফল ব্যবসায়ীই নন, তিনি দেশ গঠনের এক অনন্য কারিগর। তাঁর কষ্টার্জিত অর্থে আজ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ আত্মনির্ভরশীল। তিনি জাতি, বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে সকলের কাছে এক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। অধিকন্তু, তিনি দেশে ও বিদেশে একজন উচ্চমনা সুফি, বিনয়ী, নিরহংকার এবং জ্ঞানী সাধক। তাঁর এই সংক্ষিপ্ত জীবনীতে আমরা তাঁর জীবন সংগ্রাম, ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং সমাজে রেখে যাওয়া মূল্যবান শিক্ষা সম্পর্কে জানতে পারব। সততা, নিষ্ঠা, কঠোর পরিশ্রম, মানবপ্রেম এবং আল্লাহভীতির পথ অনুসরণ করে তিনি যেমন ব্যবসায় জগতে সাফল্য অর্জন করেছেন, তেমনি সুফি সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে অগণিত মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালিয়েছেন। তাঁর জীবন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনীই নয়, বরং আদর্শ, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণের এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত হিসেবে চিরকাল উদ্ভাসিত থাকবে।

লেখক: আলতাফ হোসেন হৃদয় খান, প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী।
