মখদুম সোলতান আউহাদুদ্দিন মীর সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী রঃ এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

Untitled design - 2026-07-14T183651.221

বিশ্বের আনাচে কানাচে আউলিয়াকে কেরামগণের মিশনের অনেক বিখ্যাত কেন্দ্র গড়ে উঠেছে তন্মধ্যে পাক-ভারত উপমহাদেশের তাসাউফ চর্চার প্রাণকেন্দ্র আধ্যাত্মিক পীঠস্থান ইসলাম প্রচারের কেন্দ্র “কাছাউছা শরীফ” অন্যতম| বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশস্থ জেলা ফয়েজাবাদে আপন পীর ও মুর্শীদ হযরত আলাউল হক পান্ডবী (রঃ)‘র নির্দেশনায় আস্তানা প্রতিষ্ঠা করেন হযরত মীর ˆসয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী (রঃ)| প্রতিবছরের ন্যায় ২৬. ২৭ ও ২৮শে মহররম ১৯৪৮ হিজরী তথা ১৩,১৪,ও ১৫ জুলাই ২০২৬ ইংরেজিতে ৬৪০তম ওরশে মাখদূমী উদযাপিত হবে| মুসলিম জাহানের প্রতিটি দেশেই এ ওরশে মাখদুমী উদযাপিত হয়| বলা হয়, মাখদুম আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানীর দরবারে যাদের ডাক পড়ে তাহারাই ওরশ শরীফে হাজির হন| ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে হযরত মাহবুবে ইয়াজদানী গাউসুল আলম, গাউছুল আলম, মখদুম সোলতান আউহাদুদ্দীন মীর ˆসয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী (রাঃ) এঁর ৬৪০তম ওরশে মাখদূমী উপলক্ষে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি উপস্থাপন করলাম|
জন্ম ঃ- ১২৮৫ সাল, ৭০৮ হিজরী ১৩০৮ সালে, ইরানের সিমনান প্রদেশে|
ওফাত ঃ- ১৪০৫সাল, ১৩৮৬বঙ্গাব্দ, ৮০৮ হিজরী ২৮ শে মহররম, কিছাউছা, আম্বেদকর নগর, ভারত
পিতা ঃ- সুলতান ইব্রাহীম নুর বখসী কুতুবউদ্দীন সিমনানের সুলতান (হযরত হোসেন ইবনে আলী (রাঃ)‘র বংশ থেকে তার কন্যা ফাতিমার মাধ্যমে নবী করিম (সঃ) এর বংশধারা) মাতা ঃ- বিবি খাদিজা (তুর্কি সুফি সাধক আহমদ ইয়াসাভির বংশধর) পূর্বসুরী ঃ- হযরত শায়েখ আলাউল হক ওয়াদ্দীন গঞ্জেনাবাত পান্ডুবী (রাঃ) উত্তরসূরী ঃ- হযরত আবদুর রাজ্জাক নুরুল আইন (রাঃ) উপাধী ঃ- গাউছুল আলম, মাহবুবে ইয়াজদানী, কুদওয়াতুল কুবরা, সুলতান, আশরাফ জাহাঙ্গীর, মখদুম-এ- সিমনানী|
শিক্ষা দীক্ষা ঃ চার বছর চার মাস চার দিন বয়সে শিক্ষার হাতে খড়ি বিসমিল্লাহ শরীফের মাধ্যমে ছবক দেন মাওলানা ইমাদুদ্দী তিরমিজী (রাঃ) অতঃপর পিতার হাতে ধর্ম শিক্ষা শুরু করেন| ৫ বছরে পবিত্র কুরআনুল করীম,সাত ক্বেরাত সহকারে হিফজ সম্পন্ন করেন| সাত বছর বয়সে আরবী ভাষার উপর বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেন| চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি কোরআনের তাফসীর, হাদীস শরীফ, ইলমে ফিকাহ সহ প্রচলিত প্রায় সব বিষয়ের উপর গভীর পান্ডিত্য অর্জন করেন এবং অতি অল্প সময়ে যুদ্ধবিদ্যাতেও পারদর্শিতা অর্জন করেন|
বাদশাহী পরিত্যাগ ঃ আব্বাজানের ইন্তেকালের পর সিমনান রাজ্যের সালতানাতের দায়িত্বভার ১৫ বছর বয়সে গ্রহন করেন| ২৩ বছর বয়সে সিংহাসন ত্যাগ করে ছোট ভাই মুহাম্মদ আরাফের হাতে ন্যস্ত করে আধ্যাত্মিকতার তীব্র আকর্ষণে মায়ের অনুমতিক্রমে হযরত আলাউল হক পান্ডুবীর সাথে দেখা করার জন্য বাংলার উদ্দেশে এক সূদীর্ঘ সফর শুরু করেন|

Description of image


সফর ঃ- তরিকা হল সুফিবাদের একটি ধর্মীয় আদেশ, রহস্যময় শিক্ষা, উদ্দেশ্য হাকিকত বা চুড়ান্ত সত্য অন্বেষণ করা| হযরত আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী সূদীর্ঘ ২বছর কাল সফর করে অনেক সুফিদের সাথে সাক্ষাৎ করে ফয়েজ ও তাবাররুক লাভে ধন্য হয়েছেন| সুফিবাদের নিগুঢ় তথ্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছেন| সিমনান হতে প্রথমে বুখারায় পৌছেন সেখানে জনৈক মজজুব দরবেশের সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি পূর্বদিকে নির্দেশ করে অবিলম্বে রওয়ানা হবার নির্দেশ দেন| বুখারা হতে সমরখন্দের শেখুল ইসলামের সাথে সাক্ষাৎ করে একরাত আতিথেয়তা গ্রহনের পর সঙ্গী সাথী সকলকে মধ্যরাতে ঘুমের মধ্যে রেখে বের হয়ে যান| অনেকদিন পাহাড় জঙ্গল ও অচেনা পথ অতিক্রম করে সিন্ধু প্রদেশের প্রখ্যাত শহর ‘উঝ’ এ পৌছেন এখানে মখদুম জালাল উদ্দিন জাহানিয়া জাহাগঁশত (রঃ) এর সাথে মোলাকাত করে তিনদিন অবস্থান করেন| উনার নির্দেশে হযরত আলাউদ্দিন গঞ্জেনাবাত (রাঃ )‘র সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন| দিল্লী পৌছালে সেখানকার বেলায়েতধারী বুজুর্গ বলেন “আশরাফ” তোমাকে ¯স্বাগতম, কিন্তু এখানে তোমার বিলম্ব করা ঠিক হবে না ভাই, “আলাউদ্দিন গঞ্জেনাবাত (রঃ) তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন|” অতপর তিনি পূর্বদিকে রওয়ানা হলেন| তিনি পান্ডুয়ার হযরত সুলতানুল মুরশেদীন শেখ আলাউল হক ওয়াদ্দীন (রাঃ)‘র খানেকার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন| পীর ও মুর্শীদ পূর্ব হতেই তার আগমনের বিষয় জ্ঞাত ছিলেন| জানা যায় যে হযরত খিজির (আঃ) হযরত আলাউদ্দিন গঞ্জেনাবাতকে তার সম্পর্কে ৭০ বার জ্ঞাত করেছেন| তাই তিনি তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন| হযরত আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী যখন পান্ডূয়া শরীফের নিকটবর্তী হন তখন হযরত আলাউল হক গঞ্জেনাবাত পান্ডুবী স্বীয় কামরায় আরাম করছিলেন| তিনি অদৃশ্যভাবে জানতে পারলেন হযরত আশরাফের আসার খবর, তিনি পূর্বে থেকেই শীষ্যদের বলে রেখেছিলেন উনার আসার খবর তিনি খানেকার বাইরে এসে বললেন, “বুয়ে ইয়ার মী আয়দ” ‘বন্ধুর সুভাস ভেসে আসছে’ অতপর তিনি সঙ্গী সহচর ও মুরীদসহ বিশাল মিছিল সহকারে স্বীয় খানেকাহ হতে বের হলেন| এক অপূর্ব দৃশ্য, হযরত আলাউল হক পান্ডুবি অতি বিখ্যাত বুজুর্গ ব্যক্তি হিসেবে বাংলার তৎকালীন বাদশাহর কাছে শ্রদ্ধেয় ছিলেন| তিনি যাচ্ছেন একজন মেহমানকে মহাসমাদরে এগিয়ে আনার জন্য| নিশ্চয়ই সেই মেহমান হযরতের কাছে তেমনই প্রিয় ও আদরের| অবশেষে হযরত আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী দূর হতে হযরত আলাউল হক পান্ডুবীকে চিনতে পারলেন এবং তিনি দৌড়ে এসে হযরতের ক্বদমে উপুড় হয়ে পড়লেন| হযরত আলাউল হক পান্ডুবী তাড়াতাড়ি ˆসয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানীকে বুকে তুলে নিয়ে বললেন,“ তোমার আসার পূর্বে হযরত খিজির (আঃ) তোমার আসার ব্যাপারে সত্তর বার আমার কাছে এসেছেন এবং বলেছেন যেন তোমার যত্নের ব্যাপারে কোন ঢিলেমি না দেখানো হয়| যেহেতু তুমি আল্লাহর এক আমানত ¯^রূপ যা আমার নিকট এসে উপনীত হবে” খানেকায় পৌছে হযরত আলাউল হক পান্ডুবী অতি আদরের সাথে ˆসয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানীকে নিকটে বসালেন এবং বললেন “বৎস! আজ পার্থিব মোহ থেকে হাত ধুয়ে ফেল, নইলে মিলনের মধুরতা থেকে বঞ্চিত থাকতে হবে|” একথা শুনে অতি বিনয়ের সাথে উত্তর দিলেন যে, হ্যাঁ তিনি এ থেকে পূর্বেই পবিত্র হয়েছেন বলে আজ মহান মুর্শিদের দরবারে হাজির হবার সৌভাগ্য নসীব হয়েছে| তারপর তিনি প্রিয়তম ভক্তকে নিজ হাতে আহার্য মুখে তুলে খাওয়ালেন| ইতোপূর্বে এ পরম সৌভাগ্য কারো ললাটে জোটেনি| খাওয়া শেষে তিনি সকল লোককে কামরা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করেন| শুধুমাত্র মীর ˆসয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী ¯^ীয় মুর্শিদের সাথে থাকতে পারলেন| পীর ও মুর্শীদ তাকে একাকী বাইয়াত করালেন এবং নেয়ামত দানে সৌভাগ্যবান করলেন| মুর্শীদ তাকে হাতে ধরে কামরার বাইরে এলেন, তখন তাঁর চেহরায় স্বর্গীয় নূরের আভা বিকির্ণ হতে লাগলো, মুর্শীদ বিভিন্ন পূণ্যময় স্মারক নিয়ে এসে বললেন,“ হে আমার সঙ্গী সাথীরা জেনে রাখ, বুজুর্গানে কেরামের বিভিন্ন স্মৃতি স্মারক দীর্ঘদিন আমার কাছে গচ্ছিত ছিল| এখন এর প্রাপক উপস্থিত হয়েছেন, আমি তাকে এগুলি প্রদান করলাম|” এভাবে পীর ও মুর্শীদ তাকে দিক্ষীত করে নিলেন এবং তিনিও পীরের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করলেন|
জাহাঙ্গীর উপাধী লাভ ঃ হযরত আলাউল হক পান্ডুবীর ইচ্ছা হলো তাঁকে কোন উপাধী দেয়া| তিনি গায়ব হতে নির্দেশ লাভের অপেক্ষা করতে লাগলেন| একদা শবে বরাতে তিনি অজিফা ও তসবীর জিকিরে নিয়োজিত হন| সারারাত তসবীহ তাহলীল ও মোরাকাবা মোশাহাদায় সোবহে সাদেক হয়ে গেল এমতাবস্থায় গায়ব হতে আওয়াজ ধ্বনিত হলো ‘জাহাঙ্গীর’ ‘জাহাঙ্গীর’ এ আওয়াজ শুনে তিনি বলে উঠলেন, আলহামদুলিল্লাহ! প্রিয় বৎস আশরাফ, এ উপাধীতে ভূষিত হলো| সেই থেকে তাঁর নামের সাথে জাহাঙ্গীর শব্দ সংযুক্ত হলো| শুধু তাই নয় রমজান মাসের সাতাশ তারিখ ক্বদরের রাতে হযরত আলাউল হক পান্ডুবী তাঁকে মারেফতের গুঢ় রহস্যাদি সম্পর্কেও পরিপূর্ণ জ্ঞান প্রদান করেন| এ অবস্থায় হযরত তাঁকে বললেন “বৎস কথায় বলে যে, এক বনে দুটি বাঘ বাস করে না এবং এক খাপে দুটি তলোয়ার থাকতে পারে না| তাই আমি তোমার জন্য এমন একটি স্থান নির্বাচিত করতে চাই যেখানে তুমি আপন কর্মতৎপরতা শুরু করবে এবং তোমার দয়ায় লোকজন উপকৃত হবে| আল্লাহর অগণিত বান্দা তোমার দ্বারা হেদায়ত লাভে ধন্য হবে|” জবাবে হযরত আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী বলতে লাগলেন, যাঁর সান্নিধ্যের জন্য সিংহাসন ত্যাগ করে, আত্মীয়-পরিজন বন্ধু-বান্ধব সবকিছু ছেড়ে অশেষ কষ্ট করে পরিশ্রম করেছি,যাঁর সাহচার্য লাভের জন্য অবর্ণনীয় ত্যাগ স্বীকার করেছি এবং যাঁর ছায়াতলে জীবন কাটানোর অদম্য বাসনায় আমার জীবন মন সর্বস্ব সঁপে দিয়েছি আজ সে ছায়া হতে বঞ্চিত হয়ে বিরহের অসহ্য যাতনা নিয়ে নির্বাসনসম এ ব্যবস্থা কিভাবে গ্রহন করতে পারি? বস্তুত মুর্শীদের সাথে বিচ্ছেদ ভাবনা তাঁকে কাবু করে ফেলে| তাঁর মনের এ অস্থিরতা দেখে পীর ও মুর্শীদ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে এরশাদ করলেন “বৎস এটা বিচ্ছেদ নয় বরং এতে আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন হয়েছে”| আরো দুই বছর অতিক্রান্ত হলো অতঃপর হযরত আলাউল হক পান্ডুবী তাঁকে লক্ষ করে বললেন,“ তোমাকে বিদায় করার সিদ্ধান্তের মধ্যে কিছু রহস্য আছে, যা তুমি জাননা| তুমি বরঞ্চ এতে সম্মত হও” হযরত আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী স্বীয় মুর্শীদের এ কথার উপর দ্বিমত করা সঙ্গত মনে করলেন না| অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিরূপায় হয়ে তিনি মুর্শীদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে সম্মত হলেন| জৌনপূরে যাওয়া স্থির হলো| দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর কাল পর পীর ও মুর্শীদ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি ৭৪২ হিজরী সনে ঈদের দিন জৌনপুর অভিমুখে রওয়ানা হন|


জৌনাপুরে তখন বিখ্যাত সাধক শেখ হাজী সদরুদ্দীন চেরাগে হিন্দ সোহরাওয়ার্দী বাস করতেন| পীর ও মুর্শিদের কাছে হযরত ˆসয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী তাঁর দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বাঘের নিবাস হিসেবে জৌনপুরকে আখ্যা দিলে পীর সাহেব জবাব দিয়েছিলেন,‘না’ ভয়ের কিছু নাই| তাঁকে বাঘ নয় বাঘের শাবক হিসেবেই পাবে সে নিজেই তোমাকে বাঘ হিসেবে বুঝে শুনে চলবে| রাজকীয় বিদায় দেন পীর ও মুর্শীদ হযরত আশরাফ জাহাাঙ্গীর সিমনানী কে| যাত্রা পথে ‘আরল’ নামক স্থানে অবস্থান করেন অতপর আজমগড় জেলার মোহাম্মদাবাদ পৌছেন এবং বসতির বাইরে এক বাগানে তাবু গেড়ে অবস্থান করতে লাগলেন| জৌনপুরের কাছাকাছি জাফরাবাদে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেন| এলাকার আলেম ওলামা ওনার কাছে আসতে থাকে এবং শরিয়ত ও ত্বরিকতের বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হয়, মতভেদ হয় এবং পরবর্তীতে সকল ধরনের সমস্যার সমাধান হয়| হযরতের প্রতি সকল মানুষের ভক্তি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং বিভিন্ন কারামত প্রকাশ পেতে থাকে| হযরত আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী (রাঃ)‘র সফরের বর্ণনা বিশাল এবং বিস্তৃত| আরব ও আজমের পূণ্যভুমিতে ভ্রমণ করে পূণরায় পীরের দরবারে আসেন প্রায় তিন থেকে চার বছর মুর্শীদের দরবারে অবস্থান করে বিদায় নেন|
কিছাউছা শরিফে অবস্থান ও কারামত ঃ বিদায় কালে মুর্শীদ হযরত আলাউল হক পান্ডুবী তাঁকে আধ্যাত্মিক দৃষ্টি দ্বারা স্বীয় কর্মস্থল নির্দেশ করেন| হযরত আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী বলেন, সেটি একটি গোলাকার পুস্করিনী হিসেবে আমার বাতেনী কাশফের চোখে দৃশ্যমান হয়, তার মধ্যবর্তী স্থানে একটি তিলের ন্যায় ফোটা রয়েছে, যেটি তিলের মতো দেখতে সেটি হলো একটি টিলা| হযরত আলাউল হক পান্ডুবী বললেন, এটিই তোমার গন্তব্য স্থান| হযরত বেনারস হতে জৌনপুর গমন করেন| জৌনপুর হতে আসলেন কিরমীনি নামক স্থানে তিন চার দিন অবস্থান করেন সেখান হতে ৪ মাইল দুরে অবস্থিত ভডবন্ড বা ভদড় বর্তমান কাছওয়াছা শরীফ নামক স্থানে তশরীফ আনেন| এখানকার শাসক মাহমুদ এবং তার পুত্রগণসহ বহুলোক হযরতের হাতে বাইয়াত গ্রহন করেন| এবং হযরতের সাহায্যে এগিয়ে আসেন| উল্লেখ্য, এ স্থান হযরতের কাছে অত্যন্ত পছন্দ হলো| তাঁর মুর্শীদের নির্দেশিত স্থান হিসেবে তিনি এটিকে নির্দিষ্ট করলেন এবং এখানে থাকতে চাইলেন| জানা গেল, এখানকার সবচাইতে আকর্ষণীয় স্থান বলতে একটি গোলাকৃতির পুস্করিনীর পাড় দরপণ নামক জনৈক তান্ত্রিক সাধু দখল করে রেখেছে| তিনি মাহমুদকে সাথে নিয়ে সে স্থানটি দেখতে গেলেন এবং দেখে বললেন “ এটিই আমার স্থান হবে, যার কথা আমার পীর সাহেব আমাকে বলেছিলেন| বেদ্বীনদের উচ্ছেদ করা কঠিন কিছু নয়”| অত:পর তিনি একজন খাদেমকে দিয়ে তান্ত্রিক সাধুকে ঐ স্থান ত্যাগের নির্দেশ দিলেন| কিন্তু সাধু উত্তরে বললো, “আমার পক্ষে স্থান ত্যাগ সম্ভব নয়| আমার সাথে পাঁচ শতাধিক তান্ত্রিক চেলা (শিষ্য) রয়েছে| কেউ যদি তার বেলায়তের শক্তিতে সকলকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হন তবে আমি স্থান ত্যাগ করব|” এ কথা শুনে হযরত ˆসয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী সদ্য বাইয়াত গ্রহনকারী মুরীদ জামালউদ্দিনকে ডেকে বললেন “যাও, সে যত রকম যাদু প্রদর্শন করুক না কেন সব গুড়িয়ে দাও এবং প্রয়োজনে যে কোন কারামত প্রদর্শনের জন্য তোমাকে ক্ষমতা দেয়া হল|” তিনি হযরতের কাছ হতে এ ক্ষমতা ও সাহস নিয়ে এগিয়ে গেলেন দৃঢ় পদক্ষেপে| তান্ত্রিক একে একে সব শক্তি প্রদর্শন করতে থাকল, কিন্তু সব কিছু তৃণের মত ভেসে গেল| তান্ত্রিক প্রথমে পিঁপড়া ছাড়ল| হযরত জামাল উদ্দিন দৃষ্টিবান নিক্ষেপ মাত্র সব গায়েব| তারপর সে বাঘের পাল নিয়ে আক্রমণে উদ্যত হলো, সে গুলোও ব্যর্থ হলো| শেষে সে স্বীয় বল্লমকে বাতাসে উড়াতে লাগল| হযরত জামালউদ্দিন হযরতের লাঠি মোবারক আনিয়ে সেটাকে বাতাসের দিকে ছুড়ে দিলেন, হযরতের লাঠি তান্ত্রিকের বল্লমটিকে মাটিতে নামিয়ে আনল| এভাবে তান্ত্রিক তার সব ক্ষমতা প্রয়োগ করে ব্যর্থ হয়ে গেল| সে তান্ত্রিক দলবলসহ কারামত দেখে হযরতের কদমে নিজেকে সোপর্দ করল এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে হযরতের কদমে উৎসর্গীত হলো| তার পাঁচশত শিষ্য তওবা করে ইসলাম গ্রহন করল| এ স্থানের নামকরণ করা হয় ‘রূহ আবাদ’| এ স্থানে নির্মিত হলো একটি খানেকা এবং হুজরা| পরবর্তীতে হযরত এখানেই থেকেছিলেন এবং ওনার মাজার শরীফ এখানে অবস্থিত| হযরত আবদুর রাজ্জাক নুরুল আইন (রাঃ)‘র মাজার শরীফ একই স্থানে| এটি বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশস্থ ফয়েজাবাদ জেলায় অবস্থিত| আকবরপুর রেল ষ্টেশনের নিকটবর্তী বিশাখারী ও কাছওয়াছার মধ্যবর্তী পুরো এলাকাটা হেদায়তের কেন্দ্র হিসেবে বিদ্যমান|
পরলোকে মাহবুবে ইয়াজদানী ঃ মখদুম আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী রাঃ ৮৩২ হিজরী সনের মহররম মাসের চাঁদ দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং হযরত সাইয়্যেদ আব্দুর রাজ্জাক নুরুল আইন রঃ‘র এক প্রশ্নের জবাবে বললেন ঃ এ মাসে আমার পূর্ব পুরুষ সাইয়্যেদুস শোহাদা ইমাম আলী মকাম হযরত ইমাম হোসাইন রাঃ শাহাদাত বরণ করেছেন এই অধমেরও ইচ্ছা এ মাসে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ লাভ করতে| মহররমের প্রথম তারিখে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহার অসুস্থতার খবর শুনে দুরদুরান্ত থেকে মুরীদ আলেম ওলামা এবং সুফীগণ আগমন শুরু করেন| ১৭ মহররম হতে তিনি সঙ্গীহীন অবস্থায় থাকতেন| নামাজের সময় ব্যতীত সর্বদা একাকী থাকতেন| নির্দেশ অনুযায়ী ¯^ীয় গৃহের মাঝে কবর ˆতরী করা হয়| ২৭ মহররম বলেন যে, এখন আমার প্রত্যাবর্তনের সময় তাই আমি সেই নির্দেশ মাথা পেতে নিয়েছি| তিনি সকলের উদ্দেশ্যে তালিম উপদেশ ও হেদায়তের পরে হযরত নুরুল আইন (রঃ) কে তার স্থলাভিষিক্ত করেন| অতঃপর কাগজ কলম নিয়ে সেই হুজরাতে চলে যান যেখানে সমাধী তৈরী করা হয়েছিল| কবরে একদিন এক রাত অবস্থানের পর দ্বিতীয় দিন লিখিত প্রবন্ধ নিয়ে আসেন “রেসালাতুল কবর ওয়া বেশারাতুল মুরিদীন” অর্থাৎ সমাধির প্রবন্ধ ও মুরীদগণের সুসংবাদ নামে প্রসিদ্ধ ছিল| তিনি জোহরের নামাজ পর্যন্ত নিজের কাজে ব্যস্ত ছিলেন| অতঃপর মখদুম আশরাফ তাঁর প্রাণপ্রিয় খলিফা হযরত আবদুর রাজ্জাক নুরুল আইন (রঃ)র ইমামতীতে জোহরের নামাজ আদায় করার পর খানেকায় উপস্থিত হয়ে সামা মাহফিল আয়োজনের নির্দেশ দেন| তিল পরিমাণ জায়গা ছিলা না কাওয়াল শুরুতে শেখ সাদীর কবিতা আবৃত্তি করেন যখন কাওয়াল
“ যদি তোমার হস্তে আমার মৃত্যু আসে,
তবে আমি সন্তুষ্ট ও নিজেকে ধন্য মনে করব”
অংশটি আবৃত্তি করছিলেন তখনই মখদুম অচৈতন্য হয়ে পড়েন আর কাওয়াল উক্ত কবিতা পূণঃরাবৃত্তি করেন| সকলেই এই আকস্মিক অবস্থা দেখে বিস্মিত হয়| মাখদুম আশরাফ রাঃ এর পরবর্তী ইঙ্গিতে কাওয়াল নিন্মের কবিতা পড়তে শুরু করেন ঃ
“হে জীবন! তুমি সফর করলে দেখতে পাবে
সৌন্দর্যে জীবন উৎসর্গ করে দাও সহাস্যে”
উক্ত কবিতাংশ শুনামাত্রই গাউছুল আলমের রূহ পরপারের রাস্তার পাড়ি দেয়| ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন|