ইরানের পক্ষে হুথিরা, যুদ্ধে নতুন মোড়

Untitled_design_27_1200x630

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাথে ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে একটি নতুন কৌশলগত মোড় এনেছে। তাদের এই সম্পৃক্ততা শুধু ইসরায়েলের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জই তৈরি করছে না, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
গাজা যুদ্ধের পর, হুথিরা ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের উপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। প্রাথমিকভাবে, এই হামলাগুলো খুব একটা কার্যকর ছিল না। বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিহত করা হয়েছিল। তবে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তেল আবিবের একটি আবাসিক ভবনে ড্রোন হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। এটি হুথিদের সক্ষমতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের হামলা ইসরায়েলের জন্য বড় কোনো সামরিক হুমকি নয়, বরং কৌশলগত চাপ সৃষ্টির একটি কার্যকর উপায়। তবে, সবচেয়ে বড় হুমকি দেখা দেয় যখন দলটি লোহিত সাগরে নৌচলাচলকে লক্ষ্যবস্তু করে। এই পথটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত, হুথিরা লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজের ওপর প্রায় ২০০টি হামলা চালিয়েছে। ৩০টিরও বেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত একটি জাহাজ ছিনতাই করা হয়েছে। এর ফলে, বাব আল-মানদেব এবং সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে, যদি ইরান একই সাথে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় এবং হুথিরা লোহিত সাগরের পথ অবরোধ করে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক আঘাত আসতে পারে। কারণ বিশ্বের জ্বালানি ও পণ্যের একটি বড় অংশ এই দুটি পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়।
এদিকে, আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও জোরদার করা হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের উদ্যোগে ইসলামাবাদে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বৈঠকটি আজ, রবিবার (২৯ মার্চ) ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে যোগ দিতে মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যে পাকিস্তানে পৌঁছেছেন। এর লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিরতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজিশকিয়ান আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে ‘আস্থা তৈরির’ ওপর জোর দিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের সঙ্গে এক ঘণ্টাব্যাপী ফোনালাপে তিনি এ বিষয়ে জোর দেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফও ইরানের প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান। তিনি আশ্বাস দেন যে, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে পাকিস্তান তার গঠনমূলক ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তির দিক থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, রাশিয়া থেকে ইরানকে শাহেদ ড্রোনের একটি উন্নত সংস্করণ সরবরাহ করা হয়েছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা মনে করেন, মানবিক সহায়তার আড়ালে আজারবাইজানের মধ্য দিয়ে ট্রাকে করে এই ড্রোনগুলো পরিবহন করা হচ্ছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরক্ষার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে, ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই খবরকে “মিথ্যা” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেছেন, “অন্যান্য দেশগুলো ইরানকে যা-ই সরবরাহ করুক না কেন, তা আমাদের অভিযানের সাফল্যে কোনো প্রভাব ফেলবে না।”
একই সময়ে, সংঘাত বিভিন্ন ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ বাড়ছে। কুয়েতে ড্রোন হামলায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও, উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোও হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী বর্তমানে লেবাননের ভূখণ্ডে আরও গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। কিছু এলাকায় তারা সীমান্ত থেকে ৭ কিলোমিটার (৪.৩ মাইল) পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে। গত শুক্রবার, দক্ষিণ লেবাননে লড়াইয়ের সময় একটি ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র একজন ইসরায়েলি সৈন্যকে আঘাত করে এবং অন্য একজনকে গুরুতরভাবে আহত করে। আরেকটি ঘটনায়, গতকাল শনিবার ভোরে দক্ষিণ লেবাননে কর্মরত সৈন্যদের ওপর রকেট হামলায় একজন ইসরায়েলি সৈন্য গুরুতরভাবে আহত এবং আরও ছয়জন মাঝারিভাবে আহত হন।
এদিকে, কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ড্রোন হামলায় এর রাডার ব্যবস্থার “ব্যাপক ক্ষতি” হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেএনএ (কুনা) জানিয়েছে, বিমানবন্দরটি “বেশ কয়েকটি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।” তবে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা যুদ্ধে যোগ দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর ইয়েমেন থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
এদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে, তারা ইরানের রাজধানী তেহরানে “বিভিন্ন সরকারি লক্ষ্যবস্তুতে” হামলা চালাচ্ছে। এই হামলাগুলো গতকাল ভোরে চালানো হয়। তেহরানে থাকা এএফপি-র একজন সাংবাদিক জানান, ইসরায়েলি হামলার সময় তিনি রাজধানীতে প্রায় ১০টি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। তিনি আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীও দেখেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার বলেছেন যে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের এখনও “৩,৫৫৪টি” লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো বাকি আছে। ট্রাম্প বলেন, “সেগুলো (ইরানের বাকি লক্ষ্যবস্তুগুলো) খুব দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।”
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১২ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। এই হামলায় ঘাঁটির অন্তত একটি সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহত সেনাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হামলায় অন্তত ৩০৩ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন।
ইরানের হরমুজ প্রণালী দিয়ে থাই তেল ট্যাঙ্কারগুলোর নিরাপদ চলাচলের বিষয়ে একটি চুক্তি হয়েছে। থাই প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল বলেছেন, এই চুক্তি জ্বালানি আমদানি সংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে একটি বৈঠক নিয়ে আশাবাদী। শুক্রবার ফ্লোরিডার মায়ামিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এই বৈঠকটি চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই “অপরাধের” জন্য ইসরায়েলকে “কড়া মূল্য” দিতে হবে। আরাঘচি শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানান।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরান যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্থলবাহিনী ছাড়াই ইরানে তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। এই অভিযান কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে, কয়েক মাসের মধ্যে নয়।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে এই সপ্তাহে একটি উত্তপ্ত টেলিফোন কথোপকথন হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ‘অতিরিক্ত আশাবাদী’ অবস্থান নিয়ে দুজনের মধ্যে তর্ক হয়েছে।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ আলোচনা করেছেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতে তারা শুক্রবার আলোচনা করেছেন।
মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই মন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জটিল সামরিক-রাজনৈতিক সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যা ইরানের ওপর বিনা উস্কানিতে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের ফলে তৈরি হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর যৌথ হামলা চালায়। এরপর, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপরও হামলা চালায়, যা যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। ইরান ও রাশিয়া উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। এটাও জানা যায় যে, চলমান এই যুদ্ধে ইরান রাশিয়ার কাছ থেকে সহায়তা পাচ্ছে।
রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি রয়েছে। এতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও জ্বালানি সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নেই।
ইরানকে ঘিরে এই বহুমাত্রিক সংঘাতে হুথিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাদের আগ্রাসী অবস্থান, বিশেষ করে সমুদ্রপথে, বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। যদি হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগরের পথ একই সাথে বিঘ্নিত হয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই নয়, বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও একটি বড় সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

Description of image