মাদক পাচার রোধে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত

Untitled design (37)

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভী ৮-৯ মে ঢাকা সফর করেন। তাঁর ঢাকা সফরকালে মাদক পাচার, মাদকের অপব্যবহার এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা জোরদার করতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়।
পাকিস্তান এই সমঝোতা স্মারকটিকে ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করেছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী মহসিন নাকভী ঢাকায় বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
মাদক পাচার, মাদকের অপব্যবহার এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা জোরদার করতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাকিস্তান সরকারের পক্ষে ফেডারেল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভী এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই সমঝোতা স্মারকের অধীনে, উভয় দেশ মাদকের অবৈধ পরিবহন ও চোরাচালান প্রতিরোধে ব্যাপকভাবে সহযোগিতা করবে। সমাজে মাদকাসক্তির ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব নির্মূল করতে যৌথ প্রচেষ্টা চালানো হবে। অবৈধ মাদক সরবরাহ শৃঙ্খল ও পাচার নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে একটি সমন্বিত কৌশলও প্রণয়ন করা হবে।
উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো মাদক পাচার ও অপরাধী নেটওয়ার্ক বিষয়ে সময়োপযোগী গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করবে। এই সহযোগিতার মধ্যে কর্মীদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাদক প্রতিরোধ ও প্রয়োগের জন্য সর্বোত্তম কর্মপন্থা বিনিময়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সচিব-পর্যায়ের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মত হয়েছেন। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভী ‘সেফ সিটি’ প্রকল্পে বাংলাদেশকে পূর্ণ সহযোগিতার প্রস্তাব দেন এবং বলেন যে, পাকিস্তান এই উদ্যোগে বাংলাদেশ সরকারকে সম্ভাব্য সব উপায়ে সমর্থন করবে।
বৈঠকে উভয় পক্ষ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়। সন্ত্রাসবাদ দমন প্রচেষ্টা এবং মানব পাচার প্রতিরোধে সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়। দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যৌথ সন্ত্রাসবাদ দমন ব্যবস্থা নিয়ে মতবিনিময় করেন। তারা সাইবার অপরাধ, সংগঠিত অপরাধ ও আর্থিক জালিয়াতি মোকাবিলায় সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং কর্মকর্তাদের জন্য পুলিশ একাডেমি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করেন। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভী তাঁর বাংলাদেশী প্রতিপক্ষকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বাংলাদেশী প্রতিপক্ষ ‘সেফ সিটি’ প্রকল্পে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়ায় মহসিন নাকভীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
এদিকে, বাংলাদেশ জানিয়েছে যে, বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। উভয় দেশের মন্ত্রীরা আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অভিন্ন স্বার্থের ওপর জোর দিয়েছেন। দুই দেশ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও বিচারিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে।
মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং চোরাচালান চক্র দমনে যৌথ প্রচেষ্টার গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়। এছাড়াও, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হয়।
অপরাধ তদন্তে দ্রুত তথ্য ও প্রমাণ বিনিময়ের উদ্দেশ্যে ‘ফৌজদারি বিষয়ে পারস্পরিক আইনি সহায়তা’ চুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। এর ফলে, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার হবে। এছাড়াও, সন্ত্রাসবাদ ও আর্থিক অপরাধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়, যাতে অপরাধীরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে গিয়ে বিচার এড়াতে না পারে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে আধুনিক পুলিশিং ও অপরাধ তদন্ত বিষয়ে প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। দুই মন্ত্রী গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের জন্য, বিশেষ করে সাইবার অপরাধ ও সংঘটিত অপরাধ দমনে, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বৈঠকে আলোচনা হয় যে, এ বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে গঠনমূলক আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে পাকিস্তান ভূমিকা রাখতে পারে।
সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার, চোরাচালান এবং জালিয়াতি প্রতিরোধে পাকিস্তান একটি খসড়া চুক্তি প্রস্তাব করেছে। বাংলাদেশ ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্তের আলোকে বর্তমানে এই খসড়াটি পর্যালোচনা করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে তিনজন পাকিস্তানি বন্দির মুক্তির বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে মতামতের জন্য পাঠানো নথির বর্তমান অবস্থা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোরশেদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তান হাইকমিশনার ইমরান হায়দার এবং দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Description of image