জানুয়ারি 30, 2026

পূর্ব কঙ্গোর সংঘাত: জাতিগত সহিংসতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি

Untitled_design_-_2026-01-13T122453.180_1200x630

ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআরসি) পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিনের সংঘাত ক্রমেই একটি জটিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিচ্ছে। জাতিগত বৈষম্য, শরণার্থী সংকট এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনার কারণে এই অঞ্চলের পরিস্থিতি দিন দিন আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।

Description of image

বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ব ডিআর কঙ্গোর সংঘাতের শিকড় ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সে সময় রুয়ান্ডায় গণহত্যাকারী সরকার পরাজিত হওয়ার পর ইন্ট্রাহামওয়ে মিলিশিয়া ও রুয়ান্ডার সাবেক সেনারা অস্ত্রসহ পূর্ব ডিআরসিতে পালিয়ে যায়। তৎকালীন জাইর সরকার তাদের নিরস্ত্রীকরণে ব্যর্থ হয় এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে সীমান্ত এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ডিআরসিতে অবস্থান করেই রুয়ান্ডার বিরুদ্ধে হামলা চালাতে থাকে এবং একই সঙ্গে কঙ্গোলি তুতসি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল তুতসি জনগোষ্ঠীকে পূর্ব ডিআরসি থেকে উৎখাত করা এবং তাদের জমি ও সম্পত্তি দখল করা। এতে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে রুয়ান্ডা, উগান্ডা ও অন্যান্য দেশে পালিয়ে যায়।

অন্যদিকে, তানজানিয়া সরকার শরণার্থীদের নিরস্ত্র করে সীমান্ত থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ায় সে দিক থেকে কোনো বড় নিরাপত্তা হুমকি তৈরি হয়নি। তবে ডিআরসিতে শরণার্থী সংকট উপেক্ষিত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।

১৯৯৬ সালের পর শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর ভূমিকা না রাখায় হতাশা বাড়ে। একপর্যায়ে এই হতাশা সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন নামে আত্মপ্রকাশ করে—এএফডিএল (AFDL), সিএনডিপি (CNDP) এবং সর্বশেষ এম২৩ (M23)।

২০১২ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন মনুসকোর (MONUSCO) ফোর্স ইন্টারভেনশন ব্রিগেড এম২৩-কে সামরিকভাবে পরাজিত করে উগান্ডা ও রুয়ান্ডায় পিছু হটতে বাধ্য করে। তবে সরকারের সঙ্গে বিদ্রোহীদের যে শান্তি চুক্তি হয়েছিল, তা কিনশাসা সরকার পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করায় উত্তেজনা আবার বাড়ে।

দশ বছর পর, ২০২১ সালের শেষ দিকে এম২৩ আবার সক্রিয় হয়ে উত্তর কিভু প্রদেশের বিভিন্ন এলাকা দখল করে নেয়। বিদ্রোহীরা দাবি করে, তারা উগান্ডা সীমান্ত দিয়ে ডিআরসিতে প্রবেশ করেছে, রুয়ান্ডা দিয়ে নয়। তবে ডিআরসি সরকার বরাবরই রুয়ান্ডাকে এম২৩-এর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে অভিযুক্ত করে আসছে।

রুয়ান্ডা এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তারা কেবল ডিআরসি থেকে পরিচালিত এফডিএলআর (FDLR) গোষ্ঠীর হামলা থেকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। কিগালির অভিযোগ, ডিআরসি সরকার ও সেনাবাহিনী এফডিএলআরকে সহায়তা করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ পূর্ব ডিআরসি নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বার্থও সংঘাতকে ঘনীভূত করছে। অনেক ক্ষেত্রে বহিরাগত শক্তি ও সংস্থা বাস্তব পরিস্থিতি উপেক্ষা করে কিনশাসা সরকারের পক্ষ নিয়েছে। এমনকি বহু বিলিয়ন ডলারের বাজেটের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন মনুসকোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

পূর্ব ডিআর কঙ্গোর চলমান সংঘাত শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং এটি পুরো গ্রেট লেকস অঞ্চল এবং মধ্য আফ্রিকার নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।